ব্যক্তিগত ঈদ

মাছকে পানি থেকে তুলে হুইল গুটানোর পর মাছটা যেভাবে খাবি খায়, তাকিয়ে দেখলে মনে হয় মাছটা এখন টের পাচ্ছে পানির ভেতরে থাকাটা তার জন্য কত মুল্যবান ছিলো। আমি কৈশোর পর্যন্ত বুঝতে পারিনি ঈদ আসলে কতটা আনন্দময়। বাংলাদেশের হাজারো শিক্ষক ভদ্রলোকের পরিবারের ছেলের মতোই ছিলো আমার ঈদ। কখনো নতুন কাপড় পাওয়া নিয়ে অভিমান। কখনো ঈদের রাতে ইত্যাদি দেখতে পাশের বাসায় চুপিচুপি ভীড় জমানো। কখনো বন্ধুদের সাথে সিগারেট খেয়ে কাশতে থাকা, কখনো হঠাৎ সুযোগে মোটর সাইকেল চালিয়ে পঙ্খীরাজের মজা পাওয়া। তারপর সাত বছর আগে আচমকা এক ঈদের দিনে আবিস্কার করলাম, সেই অভ্যস্ত জীবনের মাঝে কয়েক হাজার মাইলের একটা দুরত্ব এসে গিয়েছে। এখনো মনে পড়ে, সেই ঈদের সকালে চুপিচুপি কিছুক্ষণ কেঁদেছিলাম। হাহাহাহাহা। সেদিন সম্ভবত নিজেকে অনেক নিঃসঙ্গ মনে হয়েছিলো।

পরের দুইটা বছর পরপর ঈদ করেছিলাম মক্কা মুকাররামায়। অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা! কা’বা এমন এক ঘর যার দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছি, কখন যেন সারারাত পেরিয়ে গেছে, ফজরের আযান শুনে সংবিৎ ফিরেছে। নিঃসঙ্গতা ওখানে অপরিচিত। বরং মন ভরা এক অনুভূতি থাকে, নিজেকে মনে হয় পৃথিবীর প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত হেটে চলা কোন মিছিলের মাঝে আনমনা এক পথিক। বিপুলা সেই স্রোতে ভাবনাগুলোর মাঝে কখনো ডুবে যাওয়া কখনো একটু নিঃশ্বাস নেয়, সময় কিভাবে যেন শুধু হারিয়ে যায়। সেসময় আমি মুহাম্মদ আসাদের লেখা ‘মক্কার পথে’ পড়েছিলাম। কয়েকটা সীরাত পড়েছিলাম, পড়েছিলাম ‘কাবা শরীফের ইতিকথা’ বইটা। ঐসব অক্ষরগুলো আর বাস্তবতা মিলে অব্যক্ত একটা রসায়নের মধ্য দিয়ে ঈদগুলো চলে গেছে। আল্লাহ তায়ালার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। মানুষের চাওয়ার যেহেতু কোন শেষ নেই। তাই স্বপ্ন দেখি এই ক্ষুদ্র জীবনে আবারও ফিরে ফিরে যেতে পারবো দুনিয়ার বুকে জান্নাতে টুকরা দুইটাতে, মক্কা এবং মদীনায়। সামান্য এ জীবনে এরচেয়ে বেশি আর কি প্রয়োজন?

তারপর থেকে এ পর্যন্ত চলছে কিছুটা আজব ধরণের ঈদ। লক্ষ লক্ষ প্রবাসীর ঈদ হয়তো এরকমই। ইসলামে ঈদ উদযাপন করা হয় তিনদিন। আমার ঈদের আনন্দ অনূভুত হয় ঈদের পরদিন, যেদিন বাংলাদেশে ঈদ সেদিন। ঈদের দিন ঘুমাই। কোন কিছু করিনা, গা ঢেলে দেয়া আলস্যের বিলাসে সময় কাটাই। বন্ধু পরিচিতদের সামাজিকতা থাকেই, কিছুটা এড়িয়ে যাই কিছুটা দেখে যাই। বাংলাদেশের ঈদের দিন স্কাইপে বা ফোনে প্রিয় মানুষদের সাথে কথা বলি। বন্ধুরা ব্যস্ত থাকে, তাদের ত্যক্ত করি। আল্লাহ এখন সামর্থ্য দিয়েছেন, চাইলে হয়তো যে কোন ব্রান্ডের কাপড় কিনতে পারি। কিন্তু নিজের জন্য স্রেফ অর্থহীন মনে হয়। কতদিন আর ঈদের কাপড় কেনা হয়নাই, মনে নাই। বরং অন্যদের আনন্দ দেখার আনন্দটা অপার্থিব। হয়তো বয়স বাড়তে বাড়তে আরো অনেক মহান হয়ে যাবো। হাহাহাহা।

এই ঈদের দিনে স্মরণ করি কত শত জনপদের মুসলিম শিশুদের, যাদের জীবনে ঈদের সত্যিকার আনন্দ এনে দিতে আমরা ব্যর্থ। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শিশু ও সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষদের ঈদ কেমন হয়? কল্পনা করলে ভয় হয় এর জন্য হয়তো আল্লাহ আমাদেরকে প্রশ্ন করবেন। আর্থিক অক্ষমতার মতো বড় বেদনা খুব কমই আছে। যদি পৃথিবীতে কোনদিন স্বপ্নের দিন আসে, যে কল্যাণময় সমাজে যাকাত দেয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়া কষ্ট হবে, সেদিনের ঈদগুলো কেমন হবে?

যাইহোক, নিজের মহৎ চিন্তার বয়ান টেনে টেনে লম্বা করে লাভ নেই। কমবেশি সবাই এসব ভাবে। নিজের মনের কালো দিকও আছে। শাহবাগিদের জন্য কোন শুভকামনা করতে কষ্ট হয়। গত তিন চার বছর যাবত জানোয়ারগুলো যে ‘অজাচার’ চালিয়েছে, তার ফলে হাজারো পরিবারে আজ ঈদের কোন আনন্দ নেই। যে কিশোর ছেলেটা মে মাসের পাঁচ তারিখ রাতে মতিঝিলে হারিয়ে গেছে, তার মায়ের অশ্রু ও বুকভাঙ্গা ব্যাথা আমাকেও বিষণ্ন করে। চট্টগ্রামের আবিদ নামে একটা ছেলের চোখ উপড়ে ফেলেছিলো পুলিশ ও লীগের পশুরা। তার মা বাবা বিষয়টা চিন্তা করারও সামর্থ্য আমার নেই। গতকাল সীতাকুন্ডে যে ভদ্রলোককে পুলিশ হত্যা করেছে, এই একটু আগে তাঁর একটি সন্তান জন্ম নিয়েছে। এই সদ্যপ্রসূতি মায়ের জন্য আগামীকাল ঈদের আনন্দ কেমন? আমি জানিনা। ইয়াতিম হয়ে পৃথিবীতে আসলো যে ছেলেটা, তার পৃথিবীটা কেমন হবে? আল্লাহ শাহবাগিদের সুমতি দিন, অথবা তাদের অনিবার্য ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে দিন।

সবকিছুর পরেই, বন্ধু ও শত্রু সবার জন্য ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদের স্বাভাবিক আনন্দ তো আছেই, তবু এ বছরের ঈদ অনেক শোকাবহ। আল্লাহ আমাদের ভালো কাজ ক্ববুল করে নিন। প্রতি বছর এই শুভ ও আনন্দময় সময় ফিরে ফিরে আসুক। এই ঈদের দিনে কারো মন খারাপ না থাকুক। তবে সাত বছর আগের সেই চুপিচুপি কান্নাকে ফিরে দেখলে একদম খারাপ মনে হয় না। মাঝে মাঝে বেদনাও সুন্দর।

ঈদ মুবারক, ঈদ সা’ঈদ।

Black-background

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s