জাফর ইকবালের মিথ্যা বলার অধিকার

আজ সারাদিন যতবার ইন্টারনেটে বসেছি বারবার ঘুরে ফিরে চোখের সামনে এসেছে জাফর ইকবালের লেখা “মিথ্যা বলার অধিকার”। বিপক্ষের বিভিন্ন বিশ্লেষণ, কখনো উপহাস দেখেছি। উনার কাল্টের সদস্যদের বিভিন্নরকম ত্যানা পেঁচানো ফ্যালাসিও দেখেছি। জাফর ইকবাল গ্রহণযোগ্য না অগ্রহণযোগ্য, সে বিতর্কে যাওয়ার আগে বরং অবিসংবাদিত সত্য হলো জাফর ইকবাল বর্তমান বাংলাদেশের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। বাঁশি বাজাতে বাজাতে ইঁদুরের পালকে এই ভদ্রলোক নিয়তির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। হাজারো ইঁদুরের একজন ইঁদুর হয়ে আমিও আমার কথাগুলো লিখে রাখছি।

আমি একসময় জাফর ইকবালকে বলতাম নবী। কারণ তার উম্মতের সদস্যরা তাকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। এবং তাদের কাছে তিনি সকল বিতর্কের উর্ধ্বে এক ধরণের ‘মাসুমিয়্যাত’ মর্যাদা ভোগ করেন। সর্বোপরি তার সম্পর্কে সমালোচনা করলে উম্মতে প্রজন্ম তেলেবেগুণে জ্বলে উঠে। প্রায় অনেক কিছু মিলে যাওয়ার পরও তাকে নবী ডাকতে কিছুটা খারাপ লাগতো। কারণ নবীর সাথে আছে নবুয়্যতের সম্পর্ক। এইটা জাফর ইকবালের নাই। সেক্যুলার মহাএজেন্ডা বা ওপারের নির্দেশের বিষয়গুলোকে ঠিক নবুয়্যত বলা যায় না।

সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে অল্প কিছু পড়তে গিয়ে নতুন একটা ধারণার কথা শিখলাম। কেউ বলেন ‘নিও-রিলিজিয়ন’, সোজা বাংলায় ‘কাল্ট’! হাহাহা। অনুভব করলাম, আমি ঠিক এই এ সংজ্ঞাটাই এতোদিন জানতাম না। জাফর ইকবাল একজন যথার্থ কাল্ট-লিডার। শাহবাগিদেরকে একটা কাল্ট হিসেবে নিলে একজন কাল্ট-গুরুর যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা দরকার, জাফর ইকবাল স্বার্থকভাবে ও কিছুটা অলৌকিকভাবে সেই স্থানটা পূরণ করেছেন।

একবিংশ শতাব্দির বাঙ্গালী নাৎসি-শাহবাগি কাল্টের গুরু তার বাণী প্রকাশ করেছেন, সারা দেশে তোলপাড় পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আজকের বাণী তার চিরাচরিত বাণীর চেয়ে সিগনিফিকেন্টলি অন্যরকম। সাধারণত গুরুর বাণী জনসমক্ষে তুলে ধরার কাজ করে প্রথম আলো।জাফর ইকবাল আর প্রথম আলো, মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। অথচ আজকেই শাহবাগি কাল্টের ইতিহাসে প্রথম ব্যতিক্রম ঘটলো। এ পর্যন্ত গুরুর বাণী দেখেছি বিডিনিউজ২৪, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, সমকাল, সংবাদ, ইত্তেফাক এবং প্রিয়ডটকমে। দেশের মোটামোটি বেশিরভাগ মাধ্যমে সিন্ডিকেটেড ভাবে এই লেখা প্রকাশ হলো, কিন্তু পালের গোদা প্রথম আলো নীরব!! বড় আশ্চর্যের বিষয়। এ অবাক হওয়া বৃদ্ধি পেতে থাকে, যখন দেখি কাল্ট-গুরু তার এ লেখাতে নাম না নিয়ে প্রথম আলোর সমালোচনা করেছেন। কিমাশ্চর্যম!

কাল্টগুরুদের বাণীগুলো সাধারণত একটু দুর্বোধ্য হয়। জাফর গুরুর বাণী তার এক ধাপ উপরে। একদম সাদাসিধে কথা, তবে শব্দের পরতে পরতে কোডিং করা মেসেজ। ঐ মেসেজ কেবলমাত্র ডিকোড করতে পারে বিশেষ শাহবাগি চ্যাতনায় ভরপুর মস্তিস্ক। বাকিরা কেবলই ধন্দ্বে পড়ে যায়, গুরু কি বলতে চেয়েছেন। গুরু শুরু করেন, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটা কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দিয়ে, যেখানে একজন সাংবাদিক মিথ্যা কথা বলেন। এরপরে যখন সবার মস্তিস্ক ওয়ার্ম আপ হয়, গুরু আচমকা শাহবাগের দিকে টার্ণ নেন। এসময় তিনি আমার দেশ পত্রিকা এবং মাহমুদুর রহমান যে কত খারাপ তা বুঝিয়ে দেন। বাণীপ্রচারের এ পর্যায়ে মিথ্যাচার প্রসঙ্গ হারিয়ে যায়, সামনে আসে কিছু ক্লাইম্যাক্স। গুরুর জীবন হুমকির সম্মুখীন, জয়ের মতো তিনিও হত্যার হুমকি পান। তিনি নির্যাতিত, বিদেশ যেতে পারেন না, অথচ জ্ঞান সাধনা করেন। প্রগতি শিক্ষা সৌকর্য নিয়ে সান্ধ্য আড্ডা দেন। আড্ডা দিতে দিতে সবাই যখন মশগুল, কাল্টগুরু জাফর তখন মোক্ষম কোপটা মেরে দেন। ৫ মে তারিখে গণহত্যার কথা মিথ্যা, আর মিথ্যা সংখ্যা তথ্য প্রচারের দায়ে অধিকার সম্পাদককে গ্রেফতার করে সরকার বাহাদুর উচিত কাজ করেছেন। ন্যায়ের শাসন সমুন্নত হয়েছে। তিনি যখন তথ্য দেন তা হয়ে যায় বাকস্বাধীনতার সৌন্দর্য্য, আর বিপক্ষ যখন তথ্য দেয় তা হয় বাকস্বাধীনতার অপব্যাবহার।

পুরো মেসেজটি মাথায় নিয়ে কাল্ট-সদস্য-সদস্যারা মেডিটেশনে চলে যান। তারপর তারা ইন্টারনেটের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে পাবলিক যেভাবে খেপেছে, নিরাপত্তার সমস্যা। সমাজবিজ্ঞানের একটা মজার বিষয় হলো, কাল্টগুলোর অগ্রসরতার ইতিহাসে এই নিরাপত্তাজনিত সংখ্যালঘু সমস্যার মুখোমুখি তারা সবখানেই হয়েছে। বিভিন্ন দেশে তাদের ষ্ট্রাটেজি বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশে হলো সুশীল সমাজ ও মিডিয়া দখলে রেখে সারভাইভ করা।

জাফরগুরুর লেখাটি পড়লে কয়েকটি খটকা লাগে। কোডিং করা মস্তিস্ক বিষয়গুলো যথাযথ চ্যানেলে ইন্টারপ্রেট করবে। খোদা মেহেরবাণ, বাংলাদেশে এখনো সবার মস্তিস্ক কোডিং সম্পন্ন হয়নাই।

তিনি লিখেন ‘একটা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় একদিন একটা খবর ছাপা হলো’। সব একটা আর একটা। ভাসুরের নাম মুখে আনলে ভাদ্রবধুর চরিত্র কলন্কিনী হয়ে পড়বে। অথচ বারবার আমার দেশ পত্রিকার নাম নিয়ে এবং মাহমুদুর রহমানের নাম ধরে বিষোদগার করতে গুরু মুক্তকচ্ছ। এইটা হলো শাহবাগি ডাবল ষ্ট্যান্ডার্ড।

প্রথম আলোর কোন রিপোর্ট থেকে এই ঘটনা ও গুরুর বিশাল আক্ষেপের সুত্রপাত তা তিনি বিস্তারিত বলেন না। এসময় তিনি আদর করে বলেন ‘আমি সেই তর্কে যাচ্ছি না’। অর্থাৎ তিনি মহান। তবে তিনি বিস্তারিত বলতে গেলে বলতে হতো ২২শে এপ্রিল প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম ‘শিক্ষক নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘন’। ঐ রিপোর্টের দ্বিতীয় বাক্য হলো “বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের একটি পক্ষের আহ্বায়কসহ কয়েকজন শিক্ষকের চাপে উপাচার্য এ নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।” এইসব বিস্তারিত বলা সুবিধাজনক না। তাই আসুন আমরাও সে তর্কে না যাই। গুরুর মানসম্মান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গুরু নিজে তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে ছাত্র-সংবাদদাতাকে শাস্তি দিলেন। কিন্তু হাইকোর্ট তা মূলতবী করে দিলো। তবে গুরু কিন্তু পরিস্কার করে এটা বলেন নাই যে হাইকোর্ট মিথ্যাচারের সহায়তা করেছে। গুরু সব কথা পরিস্কার করেন না। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা করে তদন্ত কমিটি?? বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যে লেজুরবৃত্তিক মান, আমার মতে গ্রামের পঞ্চায়েতের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সব প্রশাসনিক ক্ষমতা তুলে দেয়া দরকার।

পুরো লেখাটিতে এভাবে কাল্ট-গুরু জাফর বিভিন্ন অসঙ্গতির মাধ্যমে কোডেড মেসেজ দিয়েছেন। কিন্তু দুষ্টলোকেরা তাকে ছিড়াফারা করে আওয়ামী-বাম গোষ্ঠীর নিম্নপদস্থ ও নিম্নমানসম্পন্ন দালালে প্রতিপন্ন করেছে। ৫মে তারিখে নিহতের দলিল প্রমাণ সরকারের কাছে না দিয়ে কোন স্বাধীন তদন্ত কমিশনের কাছে দিতে চেয়েছিলো অধিকার, গুরু এ বিষয়টাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েসে। কারণ গুরু জানেন এই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার চেয়ে বড় স্বাধীন আর কেউ নাই। কাল্ট-গুরু জাফরের মেসেজ বুঝা যার তার কাজ না। হু হু।

গুরুর লেখা ‘যদি’ ক্লজ দিয়ে ভরপুর এবং নিজের হাইপোথিসিস প্রসূত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়ে শক্তিশালী। প্রথম আলোর সাথে কাল্ট-গুরুর হালকা ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, তবে তারা নিজেদের স্বার্থে আবার ঠিকঠাক হয়ে যাবেন। কোনপক্ষের কেউ যদি বেয়ারা হয়ে যায়, তবে ঘাড় ধরে সোজা করে দেয়ার জন্য দাদাবাবুদের দুতাবাস তো আছেই। সুতরাং কেয়ামত হয়ে না গেলে খুব শীঘ্রই কাল্ট-গুরুর পরবর্তী সাদাসিধে বার্তাসমূহ প্রথম আলো হয়ে প্রচারিত হবে। সুতরাং শাহবাগ কাল্টের সদস্যরা প্রথম আলো থেকে টিউন সরাবেন না।

আর যাদের এখনো ব্রেইনওয়াশ হয়নি, তারা কাল্ট-গুরু জাফরের পুরো প্রবন্ধটার মূলবার্তা “৫তারিখে মতিঝিলের গন্ডগোলে কেউ মারা যায়নি” মেনে নিন। এখন তো জাফরকে দিয়ে বলানো হচ্ছে। খুব সুন্দর ফেসবুক আর ব্লগে নোট মারাচ্ছেন। যখন জাতির জননী হাসিনা নিজে বলবেন, তখন কিন্তু তিনি কোন কোডিং এর ধার ধারেন না। আপনার জায়গা হবে আদিলুর রহমান খানের সাথে একই রিমান্ড সেলে। আপনি তখন বুঙ্গা বুঙ্গা খাবেন, আর কাল্ট-গুরু জাফর দেশের সব পত্রিকাজুড়ে বয়ান দিয়ে যাবেন, কেন এইসব গ্রেফতার ও শাস্তি প্রগতিশীলতার স্বার্থে ও দেশপ্রেম রক্ষার্থে অত্যন্ত জরুরী। এ বয়ান দেয়াটা উনার অধিকার। শাহবাগি কাল্টের লিডার হিসেবে এই দেশে তিনি যে কোন অধিকার রাখেন, মিথ্যা বলার অধিকার তো দুধভাত খেলা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s