ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক প্রসঙ্গে শাহবাগি মিথ্যাচার

মানুষের মন খুব বিচিত্র একটা জিনিস। কখনো ভাবিনি কালেকটিভলি শাহবাগিদের জন্য করুণা অনুভব করবো। কিন্তু ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাকের অসুস্থতা/মৃত্যু সংক্রান্ত মিথ্যা খবর ছড়ানো, এবং গুজব ধরা খাওয়া পরবর্তী শাহবাগি আস্ফালন/ব্যাখ্যার বহর দেখে ঠিক তাই ঘটলো।

আশ্চর্যজনকভাবে এই প্রথমবারের মতো তাদের অবস্থা দেখে কোন কৌতুক অনুভব করলাম না। কোন রাগও হলো না। একবার শুধু মনে হলো যদি পাশে বসিয়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে পারতাম। যদি শুখার সাথে সবজি সুষম পরিমিাণে মিশিয়ে একটা ষ্টিক বানিয়ে দিয়ে স্নেহভরে বলতে পারতাম, “আহারে বেচারা, কত কষ্ট করতেসে ডেষ্টিনড টু ডুম শাহবাগি বেকুবের দল”!!! 

বুকের মাঝে একটা অসীম করুণার বোধ ঠিক এ মুহুর্তে আমাকে আপ্লুত করে ফেলেছে।

কারণটা বুঝাতে গেলে একটু পেছনে যেতে হবে। লম্বা কাহানি, তাছাড়া প্রচুর প্রথম পুরুষে আমি-আমি নিয়ে নিজের কথাই সব। কিছুটা অহংকারীও মালুম হতে পারে। কি করার আছে! যার যার দুনিয়া সে সে রাজা!

যখন দেখেছিলাম বাংলাদেশে একটা অসম যুদ্ধ শুরু হয়েছে, নিজ বুঝ অনুযায়ী দুর্বলের পক্ষ নিয়েছিলাম। আন্ডারডগের প্রতি সহানুভূতির এ অভ্যাসটা সম্ভবত শৈশব থেকেই শুরু, যখন আমি বিশ্বকাপের সময় কোন কারণ ছাড়া ইটালির ষ্টিকার দিয়ে পেন্সিল বক্স ভরে ফেলতাম।

এই ট্রাইবুনাল ইস্যুর আগ-পর্যন্ত সময়ে জামাতকে অপছন্দ করি মূলত দুইটা কারণে। প্রথমত, জামাত নেতাদের গোয়ার্তুমি ও অচলায়তন মানসিকতার কারণে। আমি এখনও বিশ্বাস করি, জামাত নেতাদের চিন্তাভাবনা ও ষ্ট্রাটেজিক ষ্টাইল বর্তমান দুনিয়াতে রদ্দি মাল। এই বাস্তবতা মানতে পারেননাই উনারা। এবং নিজেরা সরে না গিয়ে একটা কনসেপ্টকে ডুবিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে।

অপছন্দ করার বড় আরেকটা কারণ ছিলো একাত্তর। প্রথম কারণটা বদলানোর মতো কিছু ঘটেনাই। তবে দ্বিতীয় কারণ যে একাত্তর ইস্যুতে সবসময় জামাতের বিরোধিতা করতাম, এই ট্রাইবুনাল আর মুক্তিযুদ্ধ ব্যাবসা এসে আমার সে চুলকানি অনেকটা উধাও করে দিয়েছে। সে অন্য প্রসঙ্গ। অন্য সময়ে হয়তো লিখবো পঠিত বইগুলো নিয়ে, রেকর্ড করা কিছু ইন্টারভিউ নিয়ে। যাইহোক।

একসময় অবাক হয়ে দেখলাম, পুরো বাংলাদেশের মিডিয়া আর রাষ্ট্রযন্ত্র বিশাল গালিভার হয়ে হাঁটুর সমান একটা একা লিলিপুট জামায়াতকে পিষে ফেলার সর্বোত চেষ্টা করে যাচ্ছে। আন্ডারডগের অবস্থাটা বুঝতে গিয়ে এসময় আমি মিডিয়ার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হই। বুঝতে চেষ্টা করি, কিভাবে বিভিন্ন ন্যারেটিভ গড়ে উঠে, আমরা মানুষেরা ঐসব ন্যারেটিভের দাস হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করে যাই।

তাই যখন আজকে জাতিসংঘের পেজে দেখি শত শত বাংলাদেশী কাদের মোল্লা আর কসাই কাদেরকে এক করে নিয়ে দেশপ্রেমের আর্তচিৎকার করে যাচ্ছে, বুঝতে পারি ওদের বেদনাটা। তবে সমস্যা হলো, যুদ্ধের সময় বেদনা বুঝাতে কোন লাভ নেই।

বর্তমান বাংলাদেশের চলতি স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের সংঘর্ষের ন্যারেটিভের অন্যতম একটা স্তম্ভ হলো জামাতপন্থীদের মিথ্যাবাদী হওয়ার ধারণা। এ ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে কিছুটা সহায়তা করেছে জামাতের লোকদের অন্ধ দলপ্রেমী কাজকর্ম। বলদগিরি। আর নিষ্ঠার সাথে বাকি মূল রসদ পুরোটাই যোগান দিয়েছে মিডিয়া।

সুতরাং এ ন্যারেটিভের মাঝখানে দাড়িয়ে একজন বাংলাদেশীকে বিশ্বাস করতে হয়, জামাত মিথ্যাবাদিদের দল। জামাত একাত্তর নিয়ে মিথ্যাচার করতে পারে। জামাতকে যদি মিথ্যাবাদি বানানো না যায় তাহলে কিন্তু মুনতাসির মামুন, এমআর আখতার মুকুল আর জাফর ইকবালদের তিলে তিলে গড়ে তোলা গ্রান্ড ন্যারেটিভ মিথ্যা হয়ে যায়।

সুতরাং চান্দে সাঈদী দেখিয়ে বাঁশেরকেল্লাকে অনিবার্যভাবে হতে হয় গুজবের ভান্ডার। কাবার ইমামের মানববন্ধন ছাপানো আমারদেশ আর মাহমুদুর রহমানকেও মিথ্যাবাদি হতে হয়। ভুয়া তথ্যের তকমা জুটে দিগন্ত টিভির কপালে। এর বিপরীতে শাহবাগিরা দাড়িয়ে যায় সত্য ও অথেনটিক তথ্যের সোল এজেন্ট হিসেবে।

সমস্যাটা ফ্রবলেম হয়ে যায় যখন ফ্রগতিশীলের দল ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাকের অসুস্থতা/মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করে তারপর ধরা খেয়ে যায়। বাসের ভীড়ে গার্মেন্টস কর্মীর শরীরে হাত চালানোর সময় আরেকজনের চোখে ধরা খেয়ে গেলে বিকৃত লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া একেকরকম হয়। কেউ মনযোগ দিয়ে বাসের ছাদ দেখতে থাকে। আর কেউ কোন কারণ ছাড়াই নিজ থেকেই বলে, ‘দেখেনতো কি ভীড় বাসের মধ্যে, উফফ’।

শাহবাগিদের হয়েছে ঐ অবস্থা। তাদের কেউ এখন বলছে আমরা গুজব ছড়াচ্ছিলাম ছাগুদের উত্তেজিত করার জন্য।

আর কেউ বলে, এটা আমরা পরিকল্পনা করে করেছি। আমাদের পরিকল্পনা সফল হয়েছে, এখন ব্যারিষ্টার রাজ্জাক আর পালাতে পারবে না। স্বয়ং তাকে বিবৃতি দিতে হয়েছে। তাকে রিভিউ শুনানীতে আসতে হবে। ভাবটা এমন যেন, ব্যারিষ্টার রাজ্জাক আগে বিবৃতি দিছিলো তিনি অসুস্থ ছিলেন!!

সেই বুড়ী মহিলার কথা মনে পড়লো যিনি হাটের মাঝখানে কাদায় আছাড় খেয়ে বসে পড়েছিলেন। এরপর কি করা যায় দ্রুত ভেবে নিয়ে তিনি পানের বাটাটা খুলে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিলেন, বসলাম যখন পানটা খেয়েই যাই।

বুড়ীমা’র কাদায় বসে পান খাওয়ার কথা শুনে হাটের লোকজন মুচকি হাসে। শাহবাগিদের নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শুনে বাংলাদেশীরাও মুচকি হাসে। মানুষ আলটিমেটলি বোকা না। মাঝখান দিয়ে শাহবাগিদের সেই গ্রান্ড ন্যারেটিভের মস্ত একটা শক্তি হাওয়া হয়ে যায়।

বেচারা শাহবাগিরা বুঝতে পারেনা এই যুদ্ধে ওদের হাতে যে কয়েকটা বড় অস্ত্র তারা ব্যাবহার করছিলো, ফাঁসি স্থগিতের নিদারুণ দুঃখে অস্থির হয়ে তারা ঐ অস্ত্র নিজেরাই ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করেছে। শাহবাগিরা শুকর হতে পারে, যে কারো পিঠে ছুরি মারতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব না। যুদ্ধের বিষয়ে আমার কিছু পিউরিটান আইডিয়াল আছে, আগের যুগের নাইটদের মতো।

ওদের হাতে যদি অস্ত্র না থাকে, তাহলে আমি সত্যিই অনেক কষ্ট পাবো। মানুষ যদি শাহবাগিদের বিশ্বাসই না করে, তাড়িয়ে তাড়িয়ে ওদের কাপড় খুলে নেয়ার সেই মধুর আনন্দ আমি কোথায় পাবো??

ব্যাবসার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা জানেন সুনাম হারিয়ে ফেললে কিভাবে ব্যাবসাটা ছোবড়া হয়ে যায়। সত্য/ মানবিকতা/ মুক্তিযুদ্ধ/ দেশপ্রেম ব্যাবসায়ী শাহবাগিদের এই তুবড়ে যাওয়া ছোবড়ামি অবস্থা দেখে তাই আজ আমার করুণা হচ্ছে।

তাদের প্রতি আমার সবিনয় অনুরোধ, যে কোন উপায়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল করে আবার যেন তারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে নেয়।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s