বুয়েট ভ্যানটেইজ পয়েন্টঃ উপসংহার

By: Aman Abduhu

বুয়েট শিক্ষক পেটানোর ঘটনায় বিশাল তিন পর্বের ফিকশন লিখে ফেললাম। কেন লিখলাম জানিনা। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা হওয়াতে। বিশ্ববিদ্যালয় শুনলেই মনে হয়, পড়ালেখা আর কো-কারিকুলারে ব্যস্ত ইয়ং ছেলেমেয়ে। বিভিন্নরকম ক্রিয়েটিভ কাজ আর প্রতিযোগিতা। টিচারদের সাথে বিভিন্ন সুযোগে বিতর্ক, সেমিনার। এখানে ওখানে নোটিশ আর এনাউন্সমেন্ট, বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্যময় কাজ পড়ালেখা আর এসাইনমেন্টে দিন সপ্তাহ মাস বছরগুলো চোখের পলকে চলে যাওয়া। জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়। বিশাল বিশাল ভবন, দীর্ঘ করিডোর, নিরব লাইব্রেরী আর পুরনো বইএর গন্ধ। সাথে নতুন নতুন সব প্রযুক্তির সুযোগ সুবিধা। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেখি, সাথে সাথে বুকের মাঝে একটু কষ্ট হয়, যদি আমাদের দেশে এমন থাকতো।

সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা হয়, বিষয়টা কল্পনা করে অবাক লাগে। আমি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি। সাথে সাথে পার্টটাইম টিউটর হিসেবে পড়াই। ঐসব ছাত্রছাত্রীরা আমাকে, অথবা কোন ফুল ফ্লেজেড টিচারকে পেটাচ্ছে, ভাবা যায় না। তাই হয়তো নাড়া খেয়েছি। যাইহোক, শেষকথাগুলো হলোঃ

১. ফিকশনে বাস্তবতার শতভাগ প্রতিচ্ছবি আশা করা বোকামী। ইতিহাস আর গল্প একসাথে লেখা একটি শাহবাগি কাজ। আমি গল্প লিখেছি, ইতিহাস না। বিস্তারিত ফুটনোটে*১ এ প্রসঙ্গে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেয়া কিছু কথা আছে। একই সাথে বাস্তবতার সাথে বিরোধী বা অসততা যেন না হয়, তা খুব দরকারী বিষয়। যেমন শুভ্রজ্যোতি শেরাটনের বারে গিয়ে এলকোহল টেনে সেলিব্রেশন করছিলো, এটা ফিকশন। কিন্তু ধর্ষক চাঁদাবাজ খুনী ছাত্রলীগের নেতাদের জন্য এটা স্বাভাবিক। কিংবা রাগিব হাসান সরাসরি কোথাও বলেনি এই শিক্ষককে জামায়াত করার অপরাধে বের করে দেয়া হোক, কারণ সে বুদ্ধিমান এবং তার কথার কনসিকোয়েন্স সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু এই কথা, চিন্তা ও কাজগুলোকে সে সবসময় মোটিভেট ও প্রমোট করেছে।

২. এই জঘন্য ঘটনার কারণ হলো ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখার জায়গা। পিরিয়ড। টিচাররা কেউ আওয়ামী লীগ করবে, কেউ জামায়াত করবে, কেউ বিএনপি করবে, ভিসি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নিয়োগ হবে দলীয় বিবেচনায়, ঐ শিক্ষাঙ্গনে খুন ধর্ষণ আর মারামারি করাটাই স্বাভাবিক। এই হলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়।

৩. সবসময় বলি, আওয়ামী-শাহবাগি এটা একটা দুষ্টচক্র। সব আওয়ামী শাহবাগি, কিন্তু সব শাহবাগি আওয়ামী না। জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির রাতে অনলাইনে জামায়াত সমর্থক শিক্ষককে তার জামায়াত সমর্থক মন্তব্যের কারণে গালমন্দ করা হয়েছে, ব্যান করা হয়েছে, তাচ্ছিল্যের সুরে তাকে ট্রিট করা হয়েছে। সেই থেকে অন্যরা শিখেছে যে শাহবাগী মতের ভিন্ন মতের শিক্ষককে বেয়াদবীর সুরে কথা বলা যায়, ধমক দেওয়া যায়, গালি দেওয়া যায়। পরের দিন ছাত্রলীগ যে বেয়াদবী করেছে তার শিক্ষা তারা ঐ গ্রুপের এডমিন এবং বেয়াদব কিছু ছাত্রদের থেকে পেয়েছে। আমি যতদূর জানি, এর আগে ছাত্রলীগ বুয়েটের কোন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস করেনি। কিন্তু শাহবাগীরা সেই সাহস তাদের যোগান দিয়েছে। সুতরাং প্রমাণ হয়ে যায়, শাহবাগিরা পলিসি মেকার, আর ছাত্রলীগের গুন্ডারা হলো তাদের মাসলম্যান।

৪. ঐ শিক্ষক জয় মা কালী, জয় ইনডিয়া লিখে মন্তব্য করেছিলেন। আসলেই কি তা সাম্প্রদায়িক মন্তব্য? আমি মনে করিনা। বরং তা বাস্তব সত্যভাষণ। বাংলাদেশের ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন এবং ডিসক্রিমিনেশন করা হচ্ছে পরিস্কার। এবং এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও জঙ্গিবাদ উসকে দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদে বেনিফিশিয়ারী হতে চায়। দেশ আর সমাজ ধ্বংস হোক, ব্যাপার না। ক্ষমতায় থাকাটাই বড় কথা। হিন্দুরা এখানে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৫. বাংলাদেশে স্বাধীনতার চেতনার নামে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। এখানে দ্বিমত পোষণ করার অর্থ, রাজনৈতিক মতভিন্নতার অর্থ হলো বাংলাদেশী থাকার সুযোগ হারানো। আপনাকে পাকিস্তান চলে যেতে হবে। ঐ শিক্ষক জামায়াত করেন, তার অর্থ যদি হয় তাকে ক্যাম্পাসে পেটানো এবং নির্মমভাবে অপমান অপদস্থ করা বৈধ, তাহলে তা পরিস্কার করে বলা উচিত।

৬. সবশেষে, এ ঘটনা কোন সুস্থ স্বাভাবিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলে, সাথে সাথে নিরপেক্ষ তদন্ত হতো, গুন্ডাগিরি করা ছাত্রদেরকে প্রশাসনিক শাস্তি তো দেয়া হতোই, সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সরকারী আইন শৃংখলা কতৃপক্ষ তাদেরকে ফিজিকাল এসল্ট, এটেম্প টু মার্ডার সহ বিভিন্ন মারাত্বক অপরাধের শাস্তি হিসেবে বেশ কয়েকবছরের কারাদন্ড দিতো নিশ্চিত। পাশাপাশি ঐ ভিকটিম শিক্ষক তাকে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যর্থতার কারণে ভার্সিটি থেকে কয়েক কোটি টাকা কমপেনসেশন বা ক্ষতিপূরণ পেতেন। বাংলাদেশে কি হবে? শুভ্রজ্যোতি আর কনকদের মতো গুন্ডারা মন্ত্রী এমপি এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দাঁত বের করে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড করবে আর দামী গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াবে।

জয় বাংলা।

*১ in my view, although I do agree with Churchwell on the paramount importance of meticulous research. But novelists are not history teachers. It’s not our job to educate people, and if we start using words like “duty” and “responsibility” about historical fiction – or any fiction – we’re in danger of leaching all the vigour out of it with a sense of worthiness. A novelist has no real duty to anything except the story he or she is creating, the characters who inhabit it and whatever view of the world he or she is offering with the novel’s ending. But if you are going to play fast and loose with historical fact for the sake of a good story, you’d better have done your research thoroughly if you want readers to take you seriously; only then will you have the authority to depart from those facts.

বাংলাদেশের গ্রেট ডিভাইডঃ ইতিহাসের প্রেক্ষিত

রোমান সম্রাজ্যে যখন গ্ল্যাডিয়েটরদেরকে বাঘ-সিংহের মুখে ছেড়ে দেয়া হতো, অথবা নিজেদের মধ্যে মৃত্যু পর্যন্ত মারামারি করতে হতো, তখন কলোসিয়াম বা স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া হাজার হাজার দর্শক সেইসব বন্য মারামারি দেখে চরম আনন্দে ফেটে পড়তো। এরা অন্যায়ভাবে মারা যাচ্ছে, না কি সম্পদ বা খ্যাতির জন্য এ কাজ করছে, না কি অত্যাচারী সম্রাটের ইচ্ছার সামনে অসহায় হয়ে এরেনাতে গিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া তার আর কোন গত্যন্তর নেই, এসব কোন ধর্তব্য বিষয় ছিলো না মানুষের কাছে। মানুষ বিভৎস মারামারি দেখতে ভালোবাসতো। একজন আরেকজনকে খুঁচিয়ে মেরে ফেলছে, অথবা কোন পশু এসে একটা মানুষকে কামড়ে কামড়ে ছিড়ে নিচ্ছে এসব দেখতে তারা ভালোবাসতো। বাস্তবতার যাতাকলে পিষ্ট মানুষজনের কাছে এগুলো ছিলো বিনোদন, কিছুটা বাঁচার আনন্দ। যত বেশি নিষ্ঠুরতা তত বেশি আনন্দ। এসব দেখতে দেখতে তারা সোৎসাহে মহাউল্লাসের চিৎকারে ফেটে পড়তো। চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার মানুষের গর্জনে আকাশ বাতাস ভরে যেতো। আর প্রধানমন্ত্রী কিংবা সম্রাটের সিংহাসনে বসে ক্যালিগুলা, নিরো অথবা টাইবেরিয়াসের মতো অত্যাচারী বিলাসপ্রবণ সম্রাটের দল মুচকি মুচকি হেসে আনন্দ নিতো। সবশেষে বুড়ো আঙ্গুল নিচু করে হত্যার ইশারা করতো, অনুমতি দিতো। তখন স্পার্টাকাস, ক্রিক্সাস অথবা ভেরাসের মতো গ্ল্যাডিয়েটররা হয় মারতো, অথবা মরে যেতো। সম্রাট হয়তো মহাউত্তেজনা শেষে হেলান দিয়ে বসে সুরাপাত্রে একটা চুমুক দিতেন। ক্ষমতার স্বাদ বড় মধুর।

সেই প্রাচীন রোমের সাথে আজকের তথাকথিত আধুনিক যুগের বাংলাদেশের তেমন বেশি একটা তফাৎ নেই। তখনও বেশ প্রতিষ্ঠিত বিচারব্যাবস্থা ছিলো, আনুষ্ঠানিক রায় দেয়া হতো। এখনও ট্রাইবুনালের নামে মোটামোটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। স্বাক্ষী মিথ্যাবাদী অথবা স্বাক্ষী নেই কিংবা জাল দলিলপত্র অথবা বাস্তবে বিবাদী ছিলো অন্য কোথাও, এসব বিবেচ্য বিষয় না। বিষয় হলো মানুষের দাবী পুরণ। মানুষ বাস্তবে দেখে বাংলাদেশ একটি ব্যার্থ অথর্ব রাষ্ট্র, দুর্নীতি সন্ত্রাস শ্রেণীবৈষম্য অনায্যবন্টন নিরাপত্তাহীনতা সব মিলে দেশটা দিন দিন পাতালে যাচ্ছে। সুতরাং মানুষের একটু রিলিফ দরকার। দেশ নিয়ে গর্বের জায়গাতে মলমের প্রলেপ দেয়ার জন্য ফাঁসি দরকার। এভাবে তথাকথিত কলংকমুক্তির সান্তনা দরকার।

দুইহাজার বছর পরে এসে এখন রোমান সাম্রাজ্য নিয়ে অনেক বই অনেক মুভি হয়। ওখানে কোন গ্ল্যাডিয়েটর অত্যাচারের শিকার হলে দেখানো হয়। সম্রাট নিরো অথবা কমোডাস এর মতো রাজাদের অত্যাচারের কাহিনী দেখানো হয়। তাতে অবশ্য সেইসব গ্ল্যাডিয়েটর অথবা রাজাদের কি আসে যায় আমি বুঝি না। তারা যারা মারার মেরেছে, যারা মরার মরেছে, যারা অত্যাচার শোষণ করার করে গেছে। এখনও যার ফাঁসি হয় সে তার জীবনে যা করার করে গেছে। যে ফাঁসি দেয় সেও গরীব দেশের গরীব মানুষকে ভুখা রেখে রাজকীয় বিলাস করে যায়। আর আমরা গরীবের দল সেই ফাঁসি কখন দেয়া হবে, কিভাবে দেয়া হবে, এখনো দেয়া হচ্ছে না কেন, লাশ নিয়ে কি হবে, কে ভি চিহ্ন দেখিয়ে আঙ্গুল দিয়ে চেতনাকে সমস্যাগ্রস্থ করে দিলো, কে সাহসী হয়ে আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করলো আর কে কলংকমুক্তিজনিত পুলক পেলো এইসব নিয়ে মেইনস্ট্রিম আর অল্টারনেটিভ মিডিয়াতে সেই দুইহাজার বছর আগের প্রাচীন রোমের উন্মাদ জনগণের মতো হিস্টিরিয়াগ্রস্থ চিৎকার করে যাই।

‘রাম যদি হেরে যেতো রামায়ণ লেখা হতো/ রাবণ দেবতা হতো সেখানে’।

আসল কথা একটাই। সময় একটা চলমান প্রক্রিয়া দুনিয়ার বাকী সব থেমে গেলেও যেইটা কখনো থামেনা। সুতরাং একজন মানুষের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত অথবা একটা প্রসেসের সমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে ব্যর্থ অথবা সফল বলার পুরোপুরি সুযোগ আসে না। এবং সে মূল্যায়নে যে চলে গেছে তার কিছু আসে যায় না। কেউ টাইবেরিয়াসের মতো আটাত্তর বছর বয়সে গিয়ে মরে, একজন অত্যাচারী রাজার পক্ষে যা করা সম্ভব তা করে। অথবা কেউ নিরোর মতো মাত্র তের চৌদ্দ বছর রাজত্ব করার সুযোগ পায় আত্বহত্যার আগে, তবে এই অল্প সময়ে যা করে তাতেই অত্যাচার অনাচারের ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। কোন গ্ল্যাডিয়েটর দীর্ঘদিন এমফিথিয়েটারে রাজত্ব করে। কেউ যোগ্যতা অথবা ভাগ্যের মারপ্যাচে পড়ে অল্পদিন পরে শেষ হয়ে যায়। ইতিহাস তাকে কিভাবে বিচার করলো বা না করলো তাতে ঐ মানুষটার কিছু আসে যায় না। সে নিজের কাছে নিজেকে কিভাবে বুঝে নিলো, উপভোগ করলো না কি হতাশ হলো, ততটুকুই তার প্রাপ্তি। আর আমরা আমজনতা থেকে যাই বিভিন্ন ব্যাখ্যা আর অর্থহীন লম্ফঝম্ফ নিয়ে ব্যস্ত।

মানুষের সমাজে জনগণ কেবলমাত্র তখনই মূল্যবান হয়ে উঠে যখন বিপ্লব সংঘটিত হয়। যখন মানুষ তার অমিত শক্তি নিয়ে জেগে উঠে সব সাজানো এমফিথিয়েটার তছনছ করে দিতে পারে। আর বাকী সব কিছু উপলক্ষ এবং পার্শ্বপ্রসঙ্গ।

Aman Abduhu

যুবলীগ নেতা খুন ও বন্দুকযুদ্ধে খুনী নিহত। আসল গোড়া কোথায়?

কাল রাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে মোবইলে নিউজ ফিড দেখছিলাম। একটা ছোট খবর দেখলাম, মিলকী হত্যা মামলা তদন্ত করার জন্য র‍্যাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে।
একটু খটকা লাগলো। র‍্যাব তো এতো সুবোধ বালক না যে, দরখাস্ত লিখে আবেদন করবে মাম্মি ডুডু খাবো। পরিস্কার বুঝা যায়, র‍্যাবকে দেয়া হবে তদন্তের ভার। তাই নিজেরা নিজেরা ভাইখেলার কাগজপত্র ঠিক রাখতে এ আবেদন।

সকালে উঠে দেখি খেলা শেষ, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ খুনী তারেক আর শাহ আলম নিহত।

নিহত মিলকীর ছোট ভাই হলো সেনাবাহিনীর মেজর, নাম রাশিদুল হক খান। মেজরের ভাই যখন, র‍্যাবের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া ছাড়া তার খুনীর আর কোন উপায়ও ছিলো না। মেজর কিসমত হায়াত, মেজর জিয়াউল আহসান এরা র‍্যাব চালায়। এক-এগারো করেছিলো মেজর মইন ইউ, মেজর মাসুদউদ্দিন, মেজর ফজলুল বারী। বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা হলো এই মেজরের দল। কিন্তু আসলে ঘটনা কি এতো সরল?

মেজর রাশিদুল হক খানের ব্যক্তিগত শোকের বাচ্চাসুলভ প্রতিশোধ হয়েছে তা ঠিক, কিন্তু এই মেজররা কখনও মূল খূনীদের একটা পশম ছিড়তে পারবেনা। বরং মেজররা এ প্রতিশোধও নিয়েছে নাটের গুরুদের পরিকল্পনা অনুযায়ী। মিলকী, তারেক, শাহআলম সবগুলো আবর্জনা ছিলো যুবলীগের কিলার বাহিনীর সদস্য, মতিঝিলের হর্তাকর্তা। ৫ তারিখ রাতে শাপলা চত্বরের আশেপাশে আলো নিভিয়ে ক্যামেরা সরিয়ে দিয়ে যে গণহত্যা হয়েছে তাতে কারা কারা কোত্থেকে এসে অংশ নিয়েছিলো তা খুব অল্প লোকেই জানে। হত্যাকারীদের মাঝে পুলিশ আর বিজিবি সদস্যরা স্বাভাবিকভাবেই কখনো মুখ খুলতে পারবে না। বাকি থাকে হাতে হাত মিলিয়ে হত্যাকান্ড চালানো সিভিলিয়ান কসাইরা। ঐরাতে ওখানে যুবলীগের যে কসাইরা কাজ করেছিলো, তারা ভারতীয় সংস্থা র’ এর জন্য বিশাল ঝুঁকি। এখন যা হচ্ছে তা হলো, অন্তর্দলীয় কোন্দল হাঙ্কিপাঙ্কি আর বন্দুকযুদ্ধের নাম দিয়ে লুজ এন্ডস গুলো ঠিক করা হচ্ছে। এছাড়াও এম্বুলেন্স দুর্ঘনটা, সড়ক দুর্ঘটনা এগুলো তো চলতেছেই।

সব পরিকল্পনার পরেও কিছু জায়গায় গিয়ে ভাগ্যের হাতে মার খেয়ে যেতে হয়। যেমন এখানে ছিলো একটা সিসিটিভি। সিসিটিভি না থাকলে টুপি পাঞ্জাবী পরা ইসলামী জঙ্গির হাতে খুন প্রমাণ হতো। টকশোগুলোতে কান্নার রোল পড়ে যেতো। নবনীতি আর আরাফাতের দল লাইভ উত্তেজিত হয়ে যেতো, তাদের চিৎকারের সাথে সাথে মুখের কোণা থেকে ফেনা ছিটকে ছিটকে পড়তো। কিন্তু সিসিটিভি সব বরবাদ করে দিলো।

সিসিটিভিতে দেখা গেছে খুনী তারেক আর শাহ আলমের গ্রুপ টুপি পাঞ্জাবী পরে কাজেএসেছিলো। এই টুপি পাঞ্জাবী পরে অপারেশন করার এমও (মোডাস অপারেন্ডি) টাও তারা শিখেছে ৫মে মতিঝিলে। ঐদিন এরা টুপি পাঞ্জাবী পরেই কোরআন শরীফ পুড়িয়েছিলো। ওখানে কোন সিসিটিভি বা ক্যামেরা ছিলো না। তারপর যথারীতি অব্যাহত সমর্থন দিয়ে গেছে পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলগুলো।

সেদিন যারা নিরস্ত্র নিরীহ মাদরাসা ছাত্র শিক্ষকদেরকে রাতের আঁধারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ও লাশ গুম করেছে, এখন ভাগ্যের হাতে তাদের প্রতিদান পাওয়া শুরু হয়েছে। হত্যার সময় তারেক যার সাথে মোবাইলে কথা বলছিলো, তারা আরো অনেক বেশি ক্ষমতাবান। কিন্তু তারাও ইনশাআল্লাহ নিয়তির এ শাস্তি এড়াতে পারবে না।

আওয়ামী লীগের যেসব লোকজন এখনো জীবিত আছে, তাদের উচিত পিছনের দিকে সবসময় খেয়াল রাখা। আওয়ামী লীগ কোন রাজনৈতিক দল না। এইটা একটা মাফিয়া অর্গানাইজেশন। মুক্তিযুদ্ধের সাইনবোর্ডেরআড়ালে খুন, অত্যচার, চাদাবাজি, ধর্ষণ, নারীব্যবসা, মাদকব্যবসা, জমিদখল এগুলো হলো আওয়ামী মাফিয়ার কাজ। এধরণের মাফিয়া অর্গানাইজেশন যত খারাপ হতে থাকে, তারা রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বড়িয়ে দেয়। এই ধরণের লুজ এন্ডস পরিস্কার করা এবং নিজেদের মাঝে গ্রুপিং করার প্রথা ততই বাড়তে থাকে।

আওয়ামী লীগ মরুক আমার কোন দু:খ নাই। এই খুনীগুলো নিহত হওয়ার কৃতজ্ঞতা স্বরুপ আমি গরীব মিসকিনকে কিছু খাওয়াতে রাজি আছি। এদের নাটের গুরু আর মূল আদেশদাতা যদি মরে, কয়েকশ দরিদ্র লোককে নিয়ে ভোজ সভা দিবো ইনশআল্লাহ। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের আলাপ রেখে বর্তমানে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার একটা নায্য দাবি আছে।

ছোট ভাই মেজর হলেই যদি প্রতিশোধ নেয়া যায়, ন্যায়বিচার! নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কি দোষ করেছে? বাংলাদেশের উচিত আমেরিকার মতো হওয়া। অস্ত্রের জন্য লাইসেন্স থাকার দরকার নেই। দেশের যে অবস্থা তাতে প্রতিটা মানুষের আত্বরক্ষা করার নায্য অধিকার আছে। সুতরাং অস্ত্রশস্ত্রকে সরকারীভাবে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে যার যার আত্মরক্ষা, প্রতিরক্ষা ও প্রতিশোধের দায়িত্ব তার তার কাঁধে ছেড়ে দেয়া হোক।।

কারণ বাংলাদেশের সামনে আরো দুর্যোগ আসছে। এইসব ক্রসফায়ার নাটকের মূল জনকের কথা মনে আছে তো? সিরাজ সিকদারের হত্যাকারী। সেই মহাপিশাচ ফেরাউনের যোগ্য নাতি এখন বাংলাদেশে। বিদেশ থেকে উপযুক্ত পরিকল্পনা সাজিয়ে সে দেশে এসেছে। এইসময় আত্বরক্ষার অধিকার থাকাটা মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

মসজিদের ঘড়ির কাটা

ভোর হয়ে আসছে। পুর্বদিকের আকাশে সাদা রঙের আভাস, কয়টা পাখি ডাকছে আশেপাশে। এসময় সবচেয়ে বেশি আনন্দের বিষয় হলো বুক ভরে নিশ্বাস নেয়া। বাতাস এতো নির্মল! মসজিদ থেকে বের হয়ে আনিস রাস্তায় এসে দাড়ালো। গ্রামের মেঠো রাস্তাটা এখানে একটু বাঁক ঘুরেছে, তার ওপাশে প্রলম্বিত ধানক্ষেত। তেইশ বছর বয়সী আনিস ইটভাটায় কাজ করে। মাত্র কৈশোর পেরুনো ছেলেটা এই প্রায়ান্ধকার ভোরবেলায় মসজিদে ফজর নামাজ পড়ে হয়তো ভাবছে আজ সারাদিন কি কি কাজ করতে হবে। সকালের নাস্তাটা কি খাওয়া যায় তাও সে ভাবছিলো।
মসজিদ থেকে মুসল্লীরা একে একে বের হয়ে আসছেন। খুব বেশি না হলেও একজন দুজন করে অন্তত দশ পনেরো জন তো হবেই। হঠাৎ ওরা সবাই চমকে উঠে। আলো অন্ধকারের ভেতর থেকে মেঠো পথ ধরে ভৌতিক আকৃতির কিছু মানুষ এগিয়ে আসছে। সামনে অস্ত্র বাগিয়ে ধরা, গায়ে ভারী পোশাক। আনিস সহ অন্য মুসল্লিরা ভীত হয়ে দ্রুত মসজিদে আশ্রয় নেয়। আর এদিকে মসজিদ মুসল্লী টুপি আর দাড়ি সহ কিছু মানুষ দেখে আগন্তুকদের চোখ চকচক করে উঠে। দ্রুত এগিয়ে এসে ওদের বিশাল বাহিনী মসজিদটিকে ঘিরে দাড়ায়। এক মুসল্লি তখনো মসজিদে ঢুকতে পারেনি, তাকে এক পুলিশ লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়।
এরপরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটে যায়। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর জেলায় মনিরামপুরের ঘটনা। এগারোটা গাড়ি থেকে নেমে আসা উর্দিপরিহিত পুলিশদের সাথে ছিলো দশ বারোজনের বিশেষ একটা দল। পায়ে কেডস আর গায়ে জিনস গেঞ্জি পরা ওদের মনে দাড়ি টুপির প্রতি অনেক ঘৃণা। তারা অন্যদের সরিয়ে মসজিদের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মসজিদের চারদেয়ালের ভেতরে আটকে পড়েছে তখন গুটিকয় মুসল্লী। হয়তো বৃথা আশা করেছিলো আল্লাহর ঘরে তাদের কোন ক্ষতি হবে না।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালার বিচার এ ধরণীর মানুষের বোধ বুদ্ধির অনেক উর্ধ্বে। পরম করুণাময় নির্বিকার আরশের উপর বসে থাকেন। আর সীমান্তের ওপার থেকে আসা দেশপ্রেমিকরা তখন চাইনিজ রাইফেলে ব্রাশফায়ার করতে থাকে মাত্র ফজর নামায শেষ করা মুসল্লীদের উপর। ওরা ট্রিগার থেকে হাত সরায় না। মুহুর্মুহু গুলী বেরিয়ে যাওয়ার ঝাকুনি আর মনের ঘৃণা সব মিলে একাকার হয়ে যায়।
মসজিদের এক পাশে একটু দূরে বাড়ির উঠানে দাড়িয়ে ছিলেন গৃহবধু মণি বেগম। তলপেটে গুলী খেয়ে সেও মাটিতে পড়ে যায়। মসজিদে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকে পয়ত্রিশ জন মানুষ। আনিসের মাথার খুলি ভেদ করে চলে যায় একটি গুলি। সকালের নাস্তা আর তার খাওয়া হয়ে উঠে না, প্রাণহীন দুচোখ তাকিয়ে থাকে গম্বুজের দিকে। মসজিদের মিহরাবের পাশে একটা ঘড়ি আছে, তার নিচে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আর জুমার সময় দেখানো ছোট ছোট ছয়টা ঘড়ির ছবি। বড় ঘড়িটার কাঁটা শুধু চলতে থাকে টিক টিক টিক। বাংলাদেশ নামের দেশটাতে জন্ম নিয়ে আনিস গর্বিত হয়েছে। তার জন্ম স্বার্থক হয়েছে।
দুইহাজার তের সালের বাইশে মার্চ শুক্রবার ফজর নামাযের পর জয়পুর গ্রামে পুলিশের মাঝে থাকা বিশেষ বাহিনীর গুলিতে আনিসের জীবনঘড়ির কাঁটা থেমে যায়। জয় বাংলা।
বিডিটুডে লিঙ্ক
অপ্রাসঙ্গিক একটি খবরনোটঃ ‘সাইমুম সিরিজের বইগুলোতে মাঝে সাঝে এমন ঘটনার কাহিনী পড়তাম। কর্ণেল বরিসের লোকেরা সিংকিয়াং এ অথবা কু-ক্ল্যাক্স-কানের খুনী একটা দল হয়তো সার্বিয়ার কোন পাহাড়ী গ্রামে এভাবে মসজিদে হত্যাযজ্ঞ চালাতো। বাংলাদেশে কোনদিন এ গল্প সত্যি হবে ভাবিনি।’