রাবেয়া স্কয়ারের শহীদ

গত সপ্তাহে রাবেয়া স্কয়ারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে খোঁজ করতে লাগলাম আশেপাশে কোন মেকানিক আছে কি না। ওখানে কেউ কেউ বললো, রাবেয়া স্কয়ারের অবস্থান ধর্মঘটে একজন মেকানিক থাকার কথা। সেই মেকানিককে খুঁজতে খুঁজতে আমি শেষপর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের ওখানে গেলাম।

ওদের তাঁবুতে লোকজন তাকে “ইলেকট্রিশিয়ান মুহাম্মদ” বলে ডাকছিলো। যখনই কোন গাড়িতে সমস্যা হয়, তাঁর ডাক পড়ে। আমার মনে হঠাৎ একটা ধারণা আসলো। এতো মানুষ এখানে! আমার মতো যাদের এরকম গাড়ি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে এই এলাকায়, তাদের কাজ করে হয়তো কিছু বাড়তি উপার্জন করার জন্য সে এখানে আছে। কিন্তু আমার গাড়ি ঠিক করে দেয়ার পর সে কোন পারিশ্রমিক নিলো না!

সুতরাং আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম: দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ কিছুদিন ধরে এই বিক্ষোভে আছেন। কাজ না করলে আপনার বাড়িঘর চলবে কিভাবে?

তাঁর উত্তর ছিলো: গত বিশ বছর ধরে আমি কাজ করেছি আর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছি। টাকাপয়সা মোটামোটি ভালোই হয়েছে, পরিবারের জন্য একটা বাড়ি বানিয়েছি। আমার মেয়েদের প্রতিপালন করেছি এবং তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আছি আমি আর আমার স্ত্রী। সুতরাং তার বেশি সমস্যা হলে বাড়িটা বিক্রি করতে পারবে এবং মোটামোটি চলে যাবে।

তাঁর উত্তরে অবাক হয়ে গেলাম। “আপনি কি আর পরিবারের কাছে ফিরবেন না?”
উত্তর পেলাম “আমার জন্য দোয়া করেন, যেন এখানে আমার মৃত্যু হয়। আমি আল্লাহর কাছে শুধু চাচ্ছি, যদি এখানে মারা গেলে আমার শহীদি মৃত্যু হয়, তবে তাই যেন হয়”।

আমরা টেলিফোন নাম্বার দেয়ানেয়া করলাম। ঐদিনের পর থেকে প্রায় তাঁর সাথে ফোনে কথা হতো। আমার খোঁজখবর নিতে দিনে একবার হলেও তিনি ফোন করতেন। গতরাতে তিনি আমাকে বলেছিলেন “তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যান, বাচ্চারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজ রাতই শেষ রাত, একটা কিছু হয়ে যেতে পারে”।

এরপর তাঁর আর কোন ফোন পাইনি। যখন গণহত্যার কথা শুনলাম, তাড়াতাড়ি তাঁর নাম্বারে ফোন করলাম। পরপর তিনবার যখন তিনি ফোন রিসিভ করলেন না, আমার মনে হলো হয়তো তাঁর দোয়া কবুল হয়ে গেছে। তাঁর নাম্বারে একটা এসএমএস দিয়ে রাখলাম “মুহাম্মদ, মনে হয় আপনি এই মেসেজের উত্তর দিতে পারবেন না। তবে আমি একান্ত আশা করি শেষপর্যন্ত আপনার চাওয়া সঠিক উদ্দেশ্যটা আপনি খুঁজে পেয়েছেন”।

কিছুক্ষণ পর একটা ফিরতি এসএমএস পেলাম “তিনি ছিলেন আল্লাহর উপর বিশ্বাসী, এবং একজন বিশ্বাসীর মতোই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমার নাম ডা. তারিক, ফিল্ড হসপিটালে কাজ করছি। মেহেরবাণী করে তাঁর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারলে তাদের এখানে আসতে বলবেন, যেন তারা দাফনের আগে জানাযায় শরীক হতে পারে।”

– লী তোয়হী’র লেখা। শায়খ খালিদ ইয়াসিনের ফেসবুকে পেজে শেয়ার করা এবং ওখান থেকে নিয়ে ভাবানুবাদ করা।