ইউসুফ কারাদাভি কি মিশরে জিহাদের ডাক দিয়েছেন?

এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইউসুফ ক্বারাদাভী সারা পৃথিবী থেকে মুসলিমদেরকে মিশরে গিয়ে জিহাদ করার আহবান জানিয়েছেন এ বিষয়টা কি সত্যি? ক্বারাদাভীকে যতদূর জানি, এখনই এ কথা বলে হঠকারিতা করার মানুষ তিনি নন।। তবু পৃথিবীতে কিছু অসম্ভব না। সোর্স কি? পেলাম নিউজইভেন্ট২৪ডটকমের লিংক।

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বড় কোন ঘটনা ঘটলে ধুমধাম বিকেলের মধ্যে একটা ব্রডশিট পত্রিকা বের হয়ে যেতো। দুই পাতার দাম এক টাকা। বিশাল লাল হেডলাইনঃ ডায়ানার মৃত্যু। তারপর পুরা পত্রিকা ভর্তি শুধু হেডলাইন আর হেডলাইনঃ ডোডি ফায়েদ ও ডায়ানার রঙ্গলীলা, যুবরাজ চার্লসের সাথে এক ভবনে থেকে একবছরে একবারও শারীরিক মিলন হয়নি (সাথে একটা বিকিনি পরা ছবি), স্বপ্নকন্যা ডায়ানার রুপচর্চার গোপন রহস্য, ডায়ানার প্রেমিকদের গোপন তালিকা গোয়েন্দাদের হাতে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথবা কখনো হতো এইরকম, বিশাল মাষ্টহেডঃ প্রেসিডেন্ট এরশাদের পতন। আর পুরা পত্রিকা ভর্তি হেডলাইনঃ কে এই রহস্যময়ী রমণী জিনাত (সাথে একটা বিশাল সানগ্লাসওয়ালা ছবি), দুর্দান্ত যৌবনা মরিয়ম যেভাবে মেরী হলেন, এরশাদের রক্ষিতাদের ছলাকলা, অফিসে বসে যৌনজ্বালা মেটানোর সময় ফার্ষ্টলেডির হঠাৎ আবির্ভাব ইত্যাদি ইত্যাদি।

এগুলো নিঃসন্দেহে কোন না কোন পত্রিকা অফিস থেকে বের হতো। কিন্তু রেজিষ্টার্ড কোন পত্রিকার নাম থাকতো না। তখন মোবাইল ফোন ছিলোনা। মানুষের তাৎক্ষণিক কৌতুহলকে পুঁজি করে কামিয়ে নেবার একটা ভালো ধান্দা ছিলো। বিক্রি হতো হটকেকের মতো। আজকাল ইন্টারনেট আছে, মানুষের কৌতুহলও বেড়ে গেছে। নিউজইভেন্ট২৪, ডিনিউজ, বাংলানিউজ২৪, এক্সওয়াইজেডনিউজ, নিউজবিডি৪৯ এরকম শত শত আবর্জনা আছে। এগুলো সব বিশ্ব ইসলামী তথ্য সাংবাদিকতার সিপাহসালার আযাদ সাইমুমের পার্টি। একমুঠো বাস্তব ঘটনার সাথে তিন চিমটে মিথ্যা কিন্তু আকর্ষণীয় বয়ান একসাথে করে একগ্লাস পানিতে দিয়ে দাও ঘুটা ঘুউটা ঘউউউটা। এগুলাকে পাত্তা দেয়ার কিছু নাই।

যাইহোক, পাত্তা না দিলেও দুনিয়ার আবর্জনা থেকে বেঁচে থাকা সহজ না। যেই ছোটভাইটা এখন জিহাদী জযবায়েতে উজ্জীবিত হয়ে ফেসবুক ব্লগে আর নিজের লুঙ্গিতে আগুন লাগাচ্ছে তার অবস্থা দেখে একটু খারাপ লাগে। বেচারা ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা জিহাদ করার জন্য সদা উন্মুখ, কিন্তু একটা দেশীয় এলজি বানানোর মতো বুদ্ধি আর জ্ঞান নাই, এসএমজি তো পরবর্তী চৌদ্দ প্রজন্মের কথা। তখন নিজেকে বুঝাই কি-ই-বা করার আছে! যাইহোক, অন্য প্রসঙ্গ থাক। দুপুরে ঐ লিংকে শিরোনাম ছিলো “বিশ্ব মুসলিম মিশরে এসে যুদ্ধ করুন: কারযাভি”। ছয় সাত ঘন্টা পর এই মুহুর্তে ঐ আবর্জনার শিরোনাম হলো “বিশ্ব মুসলিম মিশরে মুরসিকে সমর্থন করুন: কারযাভি”। আবর্জনার বোধোদয় হইসে।

একটু সার্চ দিলাম অনলাইনে। বিশাল ব্যাপার। সারা দুনিয়ায় খবর হয়ে গেছে। ইজরায়েলী পত্রিকা, খ্রিষ্টান অধিকার আন্দোলন, বজরংবলীর দল স্বয়ং সেবক স্বংঘ, মিশরের সেকুলার টিভি ও পত্রিকাগুলো এমনকি আল-আহরাম পর্যন্ত (আল-আহরাম হলো বাংলাদেশের প্রথম আলো) খেপে একাকার। ক্বারাদাভী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদেরকে মিশরে গিয়ে জিহাদ করতে ও শহীদ হতে বলেছেন/ সংঘাত উস্কে দিয়েছেন/ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিছুটা ভড়কে গেলাম। বাউরে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হচ্ছে আর একজন সচেতন নাগরিক হয়ে কিছুই জানিনা। জিহাদ করতে না পারি একটু সমর্থনও তো দিতে হবে। এইসব মিডিয়ার নাটের গুরু সবচেয়ে কট্টর ইসলামোফোবিক ও ভন্ড নাস্তিকদের আস্তানা জিহাদওয়াচ সাইটেও দেখি মারাত্বক ও ভয়াবহ বর্ণনা। সাথে ভিডিওর লিংক। অস্বীকার করার উপায় আছে? হুহ!

জিহাদওয়াচে দেখার পর প্রথম অনুভব করলাম কোথাও কোন গড়বড় আছে। শাহবাগিরা যখন বলে মদীনা সনদ ভালো তখন তার গভীর ও অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা থাকে। ব্যাপারটা ঠিক একইরকম সারা দুনিয়াতে। আর ক্বারাদাভী যদি মিশরে গিয়ে জিহাদ করার আন্তর্জাতিক আহবান জানান, তাহলে বিবিসি সিএনএন ফক্স নিউজ এতো সুবোধ বালকের মতো চুপচাপ বসে ডুডু খাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তাদের একটা ন্যুনতম মান আছে, তাই মনে যতই ইচ্ছা থাকুক জিহাদওয়াচের পর্যায়ে নামতে পারতেছে না। আর সেই জিহাদওয়াচের বাজানো পিয়ানোর তালে তালে আমার জিহাদী ভাইরা উদ্বাহু গিটার বাজিয়ে যাচ্ছেন। বাজান। কার কি করার আছে?

ক্বারাদাভীর মূল বক্তব্যটা ৩১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। ইউটিউবে আপলাড করেছে ইসলামফাইলসটিভিওয়ান ২৭ তারিখে। এ ৫ দিনে দেখা হয়েছে ২৮,২২১ বার। কিন্তু বাংলা ইংরেজি আরবী কোন সার্চ দিয়েই এটাকে সহজে পাবেন না। যেটা সবচেয়ে সহজে পাবেন তা হলো আদদীনু লিল্লাহ নামের কোন জিহাদী হারামজাদার আপলোড করা ১ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের ক্লিপ। আগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা বাক্য বাদ দিয়ে আউট অভ কনটেক্সট আপলোড করে মিথ্যা শিরোনাম দিয়েছে “কারাদাভী ফতোয়া দিয়েছেন যে মিশরের সৈন্যদেরকে হত্যা করা বৈধ এবং সারা পৃথিবীর মুজাহিদদেরকে আহবান করেছেন দক্ষ সৈন্যবাহিনীকে হত্যা করার জন্য” এইটা আপলোড হয়েছে ২ দিন আগে এবং দেখা হয়েছে এ পর্যন্ত ১৭২,৯৪৫ বার। মূল ভিডিওটার বহুগুণ বেশি।

এই জিহাদীকে হারামজাদা ডাকার কারণে রাগ করছেন?  খাড়ান। জাষ্টিফিকেশন আছে। আউট অভ কনটেক্সট বাটপারি অনেকেই করে, কিন্তু এই ছাগলটা পিউর হারামজাদা। সে এই ক্লিপ নিয়েছে অন্য একটা ক্লিপ থেকে, লাইট-ডার্ক ডটনেট নামে একটা কট্টরপন্থী খ্রিষ্টান গ্রুপের ওয়েবসাইট ক্বারাদাভীর ৩১:১৪ মিনিটের পুরো বক্তব্য থেকে ৭ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের একটা কাটপিস বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছে এভং তাতে নিজেদের লোগো বসিয়ে দিয়েছে। মূল ভিডিওটা এডিট করে তারা ফ্রেম ছোট করে এনেছে যেন সামনে রাখা আল জাযিরার লোগোওয়ালা মাইকটা দেখা না যায়। লাইট-ডার্কের ঐ ভিডিওটাও দেখা হয়েছে এ পর্যন্ত ৫২,১২৬ বার। এই জিহাদী হারামজাদা মূল ভিডিওটাও দেখেনাই। লাইট ডার্কের ভিডিও থেকে তার দুই মিনিটের ক্লিপ কেটে নিয়েছে। মূল ভিডিওটা খুজে পেতে আমার সময় লেগেছে আধাঘন্টারও বেশি। কারণ তার বর্ণনা ও কীওয়ার্ড সম্পূর্ণ আলাদা, আলজাযিরার নিজস্ব চ্যানেলেও আপলোড করা নেই। কিন্তু জিদ চেপে গিয়েছিলো। যে কেউ সার্চ দেবে আর লাইট ডার্কের ভিডিওটা দেখবে। কারাদাভী কোন কথা বলা শুরু করলে প্রথমে অবশ্যই আল্লাহ ও রাসুল সা. এর হামদ সানা পড়েন। ঐটা কোথায়? ঐ ভিডিওর শিরোনাম হলো “সাতাশ তারিখে রাবেয়া আদাবিয়্যা চত্বরের গণহত্যা প্রসঙ্গে ইউসুফ কারাদাভীর মন্তব্য”। এইটা কেউ খুঁজে পাবেনা। কিন্তু জিহাদওয়াচের দেয়া জিহাদের কাটপিস আহবান দেখে জিহাদ করার জন্য রওনা হয়ে যাবে। আমার ব্যাক্তিগত অভিমত, এদের পিছনে শক্তিশালী রকেট ভরে আগুন লাগিয়ে দেয়া দরকার। দ্রুত উড়ে চলে যাবে জিহাদ করার জন্য। বেকুবদেরকে রেখে পৃথিবীর ওজন বাড়িয়ে লাভ নেই। এমনিতেও, পৃথিবী বেকুবদের জন্য না।

যে জায়গাটাতে বিশ্ব মুসলিমের কথা আছে তার অনুবাদ নিচে দিচ্ছি। যদি মূল সোর্স না পেতাম তাহলে অনুবাদ শেয়ার করতাম না। কারণ লাইটডার্ক অথবা জিহাদওয়াচের পক্ষে এডিটেড ভিডিও বানানো অসম্ভব কিছু না।

১৯:৩৮ মিনিট থেকে শুরু “দু:খের বিষয়, মিশরের বাইরে সাংবাদিকেরা, কিছু সাংবাদিক ছাড়া আর যাদের উপর আল্লাহ দয়া করেছেন আর তারা সংখ্যায় খুবই কম, আর কোথাও মিশরের সাংবাদিকরা, তারা সবাই মিথ্যা বলছে। ওরা মিথ্যা বলছে আল্লাহর কাছে মানুষের কাছে আর এই জাতির কাছে। কল্পনা করেন মিলিয়ন মানুষকে। ওদেরকে আমরা দেখেছি রাবেয়া আদাবিয়্যা স্কয়ারে। মিশরের বিভিন্ন স্কয়ারে। মোট ৩৫ টা স্কয়ারে আমরা তাদের দেখেছি। কিন্তু মিশরের মিডিয়া, টিভি চ্যানেল, রেডিও, পত্রিকাগুলো কাউকে এর কোন কিছুই দেখায়নি। আমি আরব লীগকে বর্তমানে মিশরে যা হচ্ছে তাতে ভূমিকা রাখার জন্য আহবান জানাই। ওআইসিকে আহবান জানাই। জাতিসংঘকে আহবান জানাই। আরব লীগের কাছে আহবান করছি। নিরাপত্তা পরিষদকে আহবান করছি। সারা পৃথিবীর সমস্ত সভ্য মানুষের কাছে আহবান করছি। আমি তাদের সবাইকে আহবান জানাই যেন তারা মিশরে আসে এবং দেখে কি হচ্ছে এখানে। হায় মিশরের মানুষ। আমি সারা পৃথিবীর মুসলিমদেরকে আহবান করছি। সব জায়গা থেকে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, সব দেশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, সোমালিয়া, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, তিউনিসিয়া সিরিয়া লেবানন ফিলিস্তিন জর্ডান। পৃথিবীর সব দেশে। আমি তাদেরকে আহবান জানাই তারা যেন এর স্বাক্ষী হয়। আল্লাহ তাদেরকে শীঘ্রই কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করবেন, এই যে মানুষের উপর গণহত্যা চালানো হয়েছে তোমরা কি তা দেখেছিলে? এই পাশবিক গণহত্যা? আল্লাহর কসম, যখন আমি একে বর্বরতা নাম দিলে সত্যিকার পশুদের প্রতি অবিচার করা হবে। মানুষ যা করছে তা দেখে পশুরাও সংকোচ করবে। কাউকে খেতে চাইলে ওরা হত্যা করে এবং খায়। এভাবে হাজার হাজার হত্যা করেনা। এরা পশুর চেয়েও খারাপ …………….। আমি সারা দুনিয়ার সব মানুষকে আহবান করছি। একজন পুরুষের উচিত অবস্থান নেয়ার জন্য তাদের আহবান করছি। সভ্য ও স্বাধীন মানুষর যেমন হওয়া উচিত। সারা পৃথিবীর সভ্য ও স্বাধীন মানুষদের কাছে আহবান জানাই, তারা যেন এখানে আসে এবং এই মানুষের উপর চালানো গণহত্যা দেখে। গতাকল মিশরের এক ছোট গ্রামে ………. ”

“আমি তাদেরকে আহবান জানাই তারা যেন এর স্বাক্ষী হয়”। এখানে স্বাক্ষী শব্দটার আরবী হলো শহীদ। কারাদাভী বলেছেন ‘ইয়াকুনু শোহাদা’ অর্থ ‘তারা স্বাক্ষী হয়’। আগের ক্রিয়াপদ ‘কা-না’ দিয়ে এটা পরিস্কার। এ নিয়ে জিহাদওয়াচও ত্যানা পেচায়নাই। তারা বলেছে, কারাদাভী জিহাদের ডাক দিয়েছেন। কেউ বলেনাই যে শহীদ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। এইটা নিয়ে গিরিংগি করার চিকন বুদ্ধি বাংলাদেশী কারও থাকলে থাকতে পারে।

কারাদভীর বয়স হয়েছে, অবসরে যাওয়া দরকার ন্যাচারালি। কিন্তু এখনো অন্তত এতোবড় পাগল হননাই যে একটা দেশীয় আভ্যন্তরীন সমস্যাকে আন্তর্জাতিক জিহাদ বানিয়ে দেবেন। ফিলিস্তিনী আর সিরিয়ানদেরকে তাদের দেশ বাদ দিয়ে মিশরে এসে জিহাদ করতে ডাকবেন। যদি মিশরের অবস্থা সিরিয়ার মতো হয় তাহলে তিনি এমনিতেই আহবান করবেন। তার আগ পর্যন্ত আপনার বেশি ইচ্ছা হইলে কারাদাভীর মুখে কথা না তুলে দিয়ে নিজেরটা নিজে বলেন। বি আ ম্যান! আর খুব বেশি ইচ্ছা হইলে, এখনি মিশরে গিয়া জিহাদ করার জন্য আর তর না সইলে উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে রকেটে উঠে যান। আল্লাহ আপনার রকেটযাত্রা সফল করুন।

http://www.youtube.com/watch?v=nx9–rUUvkA#at=982

Advertisements