লি কুয়ান ইউ এর দৃষ্টিতে শেখ মুজিব

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বিয়াল্লিশ বছর। এখনো তলাবিহীন ঝুড়ি।
পৃথিবীর অনেক এয়ারপোর্টে সবুজ পাসপোর্ট দেখলে ধাক্কিয়ে আলাদা লাইনে দাড় করায়।
অনেক দেশে ‘বাংলা’ শব্দটা একটা গালির মতো।
এদেশের নেতারা চোর, জনগণ সুযোগসন্ধানী হুজুগে আর শিক্ষিতরা ডাবল ষ্ট্যান্ডার্ড।
এহেন বাংলাদেশে শেখ মুজিবকে কিংবদন্তী মনে করা হয়।
‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ছাড়া শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ করাও পাপ!
তার লুটেরা পরিবার আর লুম্পেন ধর্ষক ব্যাংক ডাকাত ছেলেদের কীর্তির বয়ান করলে আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী।
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে বাসন্তিরা খাবার না পেয়ে অন্যের বমি খেয়েছে, ভাতের ফেন খেয়েছে।
আর শেখ মুজিব সোনার সিংহাসনে বসেছে,ছেলের বিয়েতে সোনার মুকুট পরিয়েছে।
এদেশে এখনো অল্প কিছু সুবিধাভোগী মানুষ আরামে আছে,আর সাধারণ জনগণকে বেঁচে থাকার জন্য অমানুষিক সংগ্রামকরতে হয়।
যুদ্ধ করতে হয় পশুর মতো।
মাঝে মাঝে মনে হয়,কেন এই দুর্ভাগ্য আমাদের?
আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ এর আত্মজীবনীর একটা অংশ পড়ে পুরনো ধারণাটা আরেকটু শক্তিশালী হলো,আমাদের গোড়াতেই গলদ!
আমরা মুজিবের মতো একটা বাটপারকে আব্বা হিসেবে ঘাড়ে তুলে নিসি!
তার মত ধান্দাবাজ সুযোগসন্ধানী সময়ের বরপুত্র যেই জাতির আব্বা,সেই জাতির কপালে লাথি উষ্ঠা ছাড়া অন্য কিছু থাকারকথা না।
মানুষকে তুই তাই করে বুকে টেনে আপন করার ভান করা আর গরম গরম বক্তৃতা দেয়া, এবং দেশ চালানো এক কথা না।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে জনপ্রিয় হওয়া এবং সৎ মানুষ হওয়া এক কথা না।
একটা দেশকে উন্নত করতে একজন দক্ষ ও সৎ শাসকই যথেষ্ট।
যে শাসকের পক্ষে তাঁর দেশে দুর্ভিক্ষের পুর্বমুহুর্তে প্রাইভেট বিমান এবং গাড়িকে গাড়ি ভর্তি মালসামান নিয়ে বিলাসিতা করা সম্ভব না।
মালয়েশিয়ার সৌভাগ্য তারা পেয়েছে মাহাথিরকে,সিঙ্গাপুরের সৌভাগ্য তারা পেয়েছে লি কুয়ান ইউকে।
এরা শুধু রাষ্ট্রনেতাই না,এরা রাষ্ট্রগঠনকারী নেতা।

লি কুয়ান ইউ দুই খন্ডে আত্মজীবনী লিখেছেন। দ্বিতীয় খন্ড “ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টুফার্ষ্ট: দ্য সিঙ্গাপুর ষ্টোরি: ১৯৬৫-২০০০” বইয়ের ৩৬৩-৩৬৪ পৃষ্ঠায় আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক এই ভদ্রলোক শেখ মুজিবকে দেখার স্মৃতির কথা বলেছেন।
অনুবাদ (স্বল্প ভাবানুবাদ সহ) করে দেয়া হলো,এ নিয়ে বাড়তি আর কিছু বলার নেই।

অটোয়া সম্মেলনের* সময় আরেকজন মানুষকে দেখার কথা স্মরণ করতে পারি,প্রাইম মিনিষ্টার শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানবিরোধী নায়ক,পুর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে রুপান্তরের নেতা। তিনি নিজস্ব বিমানে চড়ে বেশ ভাব নিয়ে অটোয়ায় এসে পৌছান।

আমি যখন ওখানে ল্যান্ড করলাম,গায়ে ‘বাংলাদেশ’ খচিত একটি বোয়িং ৭০৭ থামানো দেখলাম। সম্মেলন শেষে যখন অটোয়া ছেড়ে যাচ্ছিলাম,বিমানটি তখনও ওখানে ঠাঁই দাড়িয়েছিলো। আট দিন ধরে এক জায়গাতে দাড়িয়ে থাকা একটা বিমান! কোন উপার্জন ছাড়া অনর্থক ও বেকার পড়ে থাকা।

ফেরার সময় যখন এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে হোটেল ছেড়ে বের হচ্ছিলাম বাংলাদেশী বিমানটার জন্য জিনিসপত্র দিয়ে দুইটা বিশাল ভ্যান বোঝাই করা হচ্ছিলো। অথচ সম্মেলনে মুজিবুর রহমান তার দেশের জন্য সাহায্য অনুদান চেয়ে কথা বলছিলেন। পাবলিক রিলেশন সম্পর্কিত যে কোন ফার্মই তাকে বিশেষ বিমানটি আট দিনের জন্য পার্কিং এপ্রনে ফেলে না রাখার জন্য পরামর্শ দেবে।

আসলে ঐ সময়টা এমন ছিলো,ব্যাক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করাটা তৃতীয় বিশ্বের বড় দেশগুলোর নেতাদের জন্য ফ্যাশন হয়ে দাড়িয়েছিলো। কনফারেন্স টেবিলে সব নেতারাই সমমর্যাদার অধিকারী,তবে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতারা বিশাল প্রাইভেট জেটে চড়ে এসে দেখিয়ে দিতো যে, তারা একটু বেশি মর্যাদার। ব্রিটিশ নেতারা আসতেন তদের ভিসি ১০ এবং কমেট নিয়ে। কানাডিয়ানদের ছিলো বোয়িং। ম্যালকম ফ্রেজারের সরকার রয়েল অষ্ট্রেলিয়ান এয়ারফোর্সের জন্য একটা বোয়িং ৭০৭ কেনার পর অষ্ট্রেলিয়ানরাও ১৯৭৯ এ এ বিশেষ দলে যোগ দেয়। আবার যেসব আফ্রিকান দেশের অবস্থা ঐসময় কিছুটা ভালো ছিলো, যেমন কেনিয়া ও নাইজেরিয়া, তাদেরও বিশেষ বিমান ছিলো।

আমি মাঝে মাঝে আশ্চর্য হতাম তাদের অবস্থা দেখে। আমি বুঝতাম না কেন তারা তাদের দারিদ্রতার বিষয়টা পৃথিবীকে বুঝানোর চেষ্টা করে না! তাদের উচিত ছিলো কাজের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টা তুলে ধরা। অথচ নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি আমাকে বলেছিলেন,যে দেশ যত বেশি দরিদ্র তারা তাদের নেতাদের জন্য তত বড় ক্যাডিলাক গাড়ি ব্যবহার করে।

সুতরাং আমি সাধারণ ও নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমানে করে ভ্রমণের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করলাম। এভাবে আমি বহু বছরের জন্য সিঙ্গাপুরকে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অফিসিয়ালি রাখতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত নব্বই দশকের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক আমাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে সিঙ্গাপুরকে ‘উচ্চমাত্রায় উপার্জনক্ষম উন্নয়নশীল দেশ’ ঘোষণা করে। সাধারণ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যেসব ছাড় ও সুবিধা দেয়া হয়, আমরা পরবর্তীতে তা আর পাইনি।

* ২-১০ অগাষ্ট, ১৯৭৩। কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বিতীয় সম্মেলন (CHOGM: Commonwealth Heads of Government Meeting)কৃতজ্ঞতা স্বীকার: কমরেডস; যারা না বললে এ নোট লেখা হতো না।ImageImage